পবিত্র জিলকদ মাস: ফজিলত, গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
ইসলামি ক্যালেন্ডারের চারটি পবিত্র ও সম্মানিত মাসের একটি হলো জিলকদ। এই মাসটি মূলত হজের মাসগুলোর অন্যতম এবং রমজান ও জিলহজ মাসের মধ্যবর্তী একটি শান্তিকালীন সময়। যুদ্ধের দামামা বন্ধ করে শান্তিতে ইবাদত ও হজের প্রস্তুতির জন্য এই মাসটি বিশেষভাবে চিহ্নিত।
১. কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জিলকদ মাসের মর্যাদা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে যে চারটি মাসকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন, জিলকদ তার একটি। আল্লাহ ইরশাদ করেন:
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ
"নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি... তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।" (সূরা তাওবা: ৩৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই চারটি মাসের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন:
"তিনটি মাস ধারাবাহিক— জিলকদ, জিলহজ ও মহররম; আর অন্যটি হলো রজব।" (সহিহ বুখারি: ৪৬৬২)
এই মাসগুলোতে গুনাহ করা যেমন জঘন্য অপরাধ, তেমনি নেক আমলের সওয়াবও অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
২. নামকরণের তাৎপর্য
'জিলকদ' (ذو القعدة) শব্দটি 'কুউদে' থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো— উপবেশন করা বা বসে থাকা। প্রাচীন আরবে এই মাসে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ করে সবাই শান্তিতে বসে থাকত এবং হজের প্রস্তুতি নিত বলে এর নাম রাখা হয়েছে জিলকদ।
৩. জিলকদ মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
এই মাসটি ইসলামের ইতিহাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী:
রাসূল (সা.)-এর ওমরাহ পালন: নবী কারীম (সা.) তাঁর জীবনের চারটি ওমরাহর সবগুলোই (হজের সাথে পালন করা ওমরাহ ব্যতীত) জিলকদ মাসে আদায় করেছিলেন। (সহিহ বুখারি: ১৭৭৮)
হুদায়বিয়ার সন্ধি: ইসলামের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হুদায়বিয়ার সন্ধি' এই জিলকদ মাসেই সম্পাদিত হয়েছিল।
বনু কুরাইজা যুদ্ধ: মদিনার ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজার সাথে যুদ্ধ এবং তাদের পরাজয় এই মাসেই ঘটেছিল।
হযরত মুসা (আ.)-এর নিয়োগ: কোনো কোনো তাফসির অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.)-এর জন্য যে ৪০ রাতের ওয়াদা করেছিলেন, তার প্রথম ৩০ রাত ছিল এই জিলকদ মাস।
৪. জিলকদ মাসের আমল ও বর্জনীয় কাজ
এই মাসে নির্দিষ্ট কোনো 'ফরজ' ইবাদত নেই, তবে বরকত লাভের জন্য মুমিনদের করণীয়:
ক. বেশি বেশি নফল ইবাদত
সম্মানিত মাস হওয়ায় এই মাসে জিকির-আজকার, তাসবিহ এবং কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব অনেক বেশি।
খ. নফল রোজা ও আইয়ামে বিজের রোজা
প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে 'আইয়ামে বিজের' রোজা রাখা সুন্নাত। রাসূল (সা.) বলেছেন:
"যদি তুমি মাসে তিন দিন রোজা রাখতে চাও, তবে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রাখো।" (সুনানে নাসায়ী)
গ. হজের মানসিক প্রস্তুতি
যেহেতু জিলকদ মাসের পরেই জিলহজ বা হজের মাস, তাই যারা হজে যাওয়ার নিয়ত করেছেন, তাদের জন্য এই মাসটি তালবিয়া পাঠ, মাসয়ালা শিক্ষা এবং শারীরিক প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ সময়।
ঘ. অন্যায় ও ঝগড়া থেকে বিরত থাকা
সম্মানিত মাসগুলোতে ঝগড়া-বিবাদ বা একে অপরের মনে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। আল্লাহ বলেছেন, "এসব মাসে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।" (সূরা তাওবা: ৩৬)
৫. একটি প্রচলিত ভুল ধারণা
অনেকে জিলকদ মাসকে 'অশুভ' বা 'বিপদ-আপদের মাস' মনে করেন, যা সম্পূর্ণ ভুল এবং ইসলামি আকিদাবিরোধী। ইসলামে কোনো মাস বা দিন অশুভ নয়। বরং এটি একটি বরকতময় মাস যা শান্তি ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দেয়।
উপসংহার
জিলকদ মাস হলো ইবাদতের মাস এবং ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি। এই মাসের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং বেশি বেশি নেক আমল করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। আল্লাহ আমাদের এই মাসে বরকত দান করুন। আমীন।