জিলহজ্জ

পবিত্র জিলহজ্ব মাস: ফজিলত, আমল ও কুরবানির গুরুত্ব

ইসলামি ক্যালেন্ডারের চারটি সম্মানিত মাসের (আশহুরুল হুরুম) মধ্যে অন্যতম হলো জিলহজ্ব। বিশেষ করে এই মাসের প্রথম ১০ দিনকে আল্লাহ তাআলা বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই ১০ দিনের গুরুত্ব রমজানের শেষ ১০ দিনের চাইতেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি।

১. কুরআন ও হাদিসের আলোকে জিলহজ্ব মাসের মর্যাদা

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে জিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ রাতের কসম খেয়েছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন:

وَالْفَجْرِ ۝ وَلَيَالٍ عَشْرٍ

"কসম ভোরবেলার এবং দশ রাতের (অর্থাৎ জিলহজ্বের প্রথম দশ দিন)।" (সূরা ফাজর: ১-২)

হাদিস শরিফে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দিনগুলোর গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেছেন:

"জিলহজ্বের প্রথম দশ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে অন্য যেকোনো সময়ের আমলের চেয়ে বেশি প্রিয়।" (সহিহ বুখারি: ৯৬৯)


২. জিলহজ্ব মাসের প্রথম ১০ দিনের বিশেষ আমল

এই ১০ দিন মুমিনের জন্য ইবাদতের বসন্তকাল। এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো হলো:

ক. বেশি বেশি জিকির ও তাসবিহ পাঠ করা

এই দিনগুলোতে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার পাঠ করা সুন্নাত। রাসূল (সা.) বলেছেন:

"এই দিনগুলোতে তোমরা বেশি বেশি করে তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) এবং তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ করো।" (মুসনাদে আহমাদ: ৫৪৪৪)

খ. নফল রোজা রাখা (বিশেষ করে আরাফার দিন)

জিলহজ্বের ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। বিশেষ করে ৯ই জিলহজ্ব (আরাফার দিন) রোজা রাখার ব্যাপারে নবীজী (সা.) বলেছেন:

"আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এটি (আরাফার রোজা) তার পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।" (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

গ. চুল ও নখ না কাটা

যারা কুরবানি করার ইচ্ছা রাখেন, তাদের জন্য জিলহজ্বের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানি না করা পর্যন্ত শরীরের চুল, নখ বা চামড়া না কাটা মুস্তাহাব। (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭)


৩. তাকবীরে তাশরীক (ওয়াজিব আমল)

৯ই জিলহজ্ব ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ্ব আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার এই তাকবীর পাঠ করা ওয়াজিব:

اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ

অর্থ: "আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড় এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।"


৪. ঈদুল আজহা ও কুরবানি

১০ই জিলহজ্ব সারা বিশ্বের সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কুরবানি করেন। এটি হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগের স্মৃতি বহন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

"অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড় এবং কুরবানি করো।" (সূরা কাউসার: ২)

তিনি আরও বলেন, "কুরবানির পশুর রক্ত বা মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।" (সূরা হজ: ৩৭)


৫. হজের গুরুত্ব

এই মাসেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলমানরা মক্কায় সমবেত হন 'হজ' পালনের জন্য। হজ হলো শারীরিক ও আর্থিক ইবাদতের এক অনন্য সংমিশ্রণ, যা একজন মানুষকে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ করে দেয়।


উপসংহার

জিলহজ্ব মাস আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়। এটি কেবল একটি মাস নয়, বরং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রশিক্ষণ। আসুন, আমরা এই মাসের প্রথম ১০ দিন ইবাদতে কাটাই এবং সামর্থ্য থাকলে সঠিক নিয়মে কুরবানি ও হজ আদায় করি। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমীন।

1 Comments

Previous Post Next Post