সফর

সফর মাস: ফজিলত, ভ্রান্ত ধারণা ও ইসলামের সঠিক শিক্ষা

ইসলামি ক্যালেন্ডারের দ্বিতীয় মাস সফর। প্রাচীন আরবে এই মাসকে নিয়ে নানা রকম কুসংস্কার প্রচলিত ছিল, যা আজও অনেকের মধ্যে রয়ে গেছে। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসের সকল অশুভ ধারণাকে বাতিল করে দিয়ে একে আল্লাহর অন্য সব মাসের মতোই বরকতময় হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

১. 'সফর' নামের অর্থ ও প্রেক্ষাপট

'সফর' শব্দের অর্থ হলো— শূন্য বা রিক্ত। ইতিহাসবিদদের মতে, মহররম মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ থাকায় আরবরা শান্ত থাকত, কিন্তু সফর মাস শুরু হলেই তারা যুদ্ধের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ত এবং তাদের ঘরবাড়ি শূন্য হয়ে যেত। আবার কারো মতে, এই মাসে আরব অঞ্চলে ভীষণ আকাল দেখা দিত বলে এর নাম রাখা হয়েছে সফর।


২. সফর মাস নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার ও হাদিসের জবাব

জাহেলি যুগে আরবরা মনে করত সফর মাস অশুভ এবং এই মাসে বিপদ-আপদ বেশি নাজিল হয়। আমাদের সমাজেও অনেকে এই মাসে বিয়ে-শাদি বা নতুন ব্যবসা শুরু করাকে অমঙ্গলজনক মনে করেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ভ্রান্ত বিশ্বাসগুলো সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ইরশাদ করেছেন:

لَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَلَا هَامَةَ وَلَا صَفَرَ

"রোগ সংক্রমণ (আল্লাহর হুকুম ছাড়া), অশুভ লক্ষণ দেখা, পেঁচা সম্পর্কে কুসংস্কার এবং সফর মাস নিয়ে অশুভ ভাবনার কোনো ভিত্তি নেই।" (সহিহ বুখারি: ৫৭০৭)

সুতরাং, সফর মাসকে অশুভ মনে করা বা এই মাসে নেক কাজ থেকে বিরত থাকা ইসলামি শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও শিরকের কাছাকাছি কাজ।


৩. সফর মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

ইসলামের ইতিহাসে এই মাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, যা মুমিনদের জন্য শিক্ষণীয়:

  • হিজরতের সূচনা: রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের উদ্দেশ্যে এই মাসের শেষ দিকেই যাত্রা শুরু করেছিলেন।

  • খায়বার বিজয়: ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ 'খায়বার যুদ্ধ' এই মাসে সংঘটিত হয় এবং মুসলিমরা বিজয় লাভ করে।

  • হযরত আলী (রা.) ও ফাতেমা (রা.)-এর বিবাহ: কোনো কোনো বর্ণনামতে, এই মাসেই জান্নাতের সরদারনি হযরত ফাতেমা (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-এর পবিত্র বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল।


৪. সফর মাসে একজন মুমিনের আমল

সফর মাসের জন্য আলাদা কোনো নামাজ বা রোজা শরিয়তে নির্ধারিত নেই। তবে সাধারণ আমলগুলো এই মাসেও পালনীয়:

  1. নফল রোজা: প্রতি হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে 'আইয়ামে বিজের' রোজা রাখা।

  2. দান-সদকা: বিপদ-আপদ থেকে বাঁচার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো দান-সদকা করা। রাসূল (সা.) বলেছেন, "সদকা বালা-মুসিবত দূর করে।"

  3. তাকওয়াহ ও তওবা: আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং সকল প্রকার শিরকি আকিদা থেকে মনকে পরিষ্কার রাখা।

  4. আখেরী চাহার শোম্বা: সফর মাসের শেষ বুধবার আমাদের দেশে 'আখেরী চাহার শোম্বা' হিসেবে পরিচিত। যদিও এটি রাসুল (সা.)-এর রোগমুক্তির স্মৃতি হিসেবে পালিত হয়, তবে একে শরিয়তের বিশেষ কোনো 'আবশ্যক ইবাদত' মনে না করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত।


৫. সফর মাসের বিশেষ শিক্ষা

সফর মাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, দিন বা মাস কখনো মানুষের ভাগ্যের ভালো-মন্দের কারণ হতে পারে না। সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:

قُل لَّن يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا

"বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে রেখেছেন, তা ব্যতীত অন্য কিছুই আমাদের ওপর আপতিত হবে না।" (সূরা তাওবা: ৫১)

উপসংহার

সফর মাস কোনো বিপদের মাস নয়, বরং এটি আল্লাহর ইবাদত এবং হিজরতের ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয়। আসুন, আমরা কুসংস্কার বর্জন করি এবং সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন যাপন করি। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

Post a Comment

Previous Post Next Post