সাবান

পবিত্র শাবান মাস: ফজিলত, আমল ও রমজানের প্রস্তুতি

ইসলামি বর্ষপঞ্জিতে শাবান মাসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক মানুষ রজব এবং রমজানের গুরুত্ব দিতে গিয়ে এই মাঝখানের মাসটিকে অবহেলা করে। অথচ হাদিস শরিফে এই মাসের বিশেষ মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে।

১. শাবান মাসের গুরুত্ব ও হাদিস

হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে শাবান মাসের মতো অন্য কোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।" তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:

ذَلِكَ شَهْرٌ يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ بَيْنَ رَجَبٍ وَرَمَضَانَ، وَهُوَ شَهْرٌ تُرْفَعُ فِيهِ الْأَعْمَالُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ، فَأُحِبُّ أَنْ يُرْفَعَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ

"এটি এমন একটি মাস যা রজব এবং রমজানের মাঝখানে হওয়ায় মানুষ একে অবহেলা করে। অথচ এই মাসে বান্দার আমলসমূহ রাব্বুল আলামীনের কাছে পেশ করা হয়। আর আমি চাই যে, যখন আমার আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হবে, তখন যেন আমি রোজা অবস্থায় থাকি।" (সুনানে নাসায়ী: ২৩৫৭)


২. শাবান মাসের বিশেষ আমলসমূহ

শাবান মাসকে রমজানের রিহার্সাল বা মহড়া বলা হয়। এই মাসের প্রধান আমলগুলো হলো:

ক. বেশি বেশি নফল রোজা রাখা

রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান ছাড়া বছরের অন্য কোনো মাসে শাবানের মতো এত বেশি নফল রোজা রাখতেন না। আম্মাজান হযরত আয়েশা (রা.) বলেন:

"আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে শাবান মাসের চেয়ে বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।" (সহিহ বুখারি: ১৯৬৯)

খ. লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (শবে বরাত)

শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত সম্পর্কে হাদিসে এসেছে:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতে (১৫ই শাবান) তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।" (ইবনে মাজাহ: ১৩৯০, সহিহ ইবনে হিব্বান)

গ. রমজানের জন্য দোয়া করা

রজব মাস থেকে যে দোয়াটি পড়া শুরু হয়, শাবান মাসেও তা অব্যাহত রাখা সুন্নাত:

اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ وَشَعْبَانَ وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ

অর্থ: "হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।"


৩. শাবান মাসে মুমিনের করণীয়

  • কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি করা: পূর্ববর্তী আলেমগণ (সালাফে সালেহীন) শাবান মাস শুরু হলে দোকানপাট বন্ধ করে কুরআনে মগ্ন হতেন। একে 'কুরআন পাঠকদের মাস' বলা হতো।

  • তওবা ও ইস্তিগফার: রমজানের পবিত্রতা ধারণ করার জন্য শাবান মাসেই মনকে গুনাহমুক্ত করার চেষ্টা করা।

  • রমজানের পরিকল্পনা: রমজানে কীভাবে সময় কাটাবেন, কয়টি খতম দেবেন এবং কতটুকু দান-সদকা করবেন, তার পরিকল্পনা এই মাসেই চূড়ান্ত করা।


৪. একটি জরুরি সতর্কতা

শাবান মাসের শেষ দু-একদিন আগে রোজা রাখা নিষেধ, যাতে রমজানের রোজার সাথে এটি মিশে না যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"তোমাদের কেউ যেন রমজানের একদিন বা দুই দিন আগে রোজা না রাখে; তবে যদি কারো নিয়মিত রোজার দিন পড়ে যায় (যেমন সোম বা বৃহস্পতিবার), তবে সে রোজা রাখতে পারে।" (সহিহ বুখারি: ১৯১৪)

উপসংহার

শাবান মাস হলো ইবাদতের চারাগাছে পানি দেওয়ার সময়, যাতে রমজানে এর ফল সংগ্রহ করা যায়। আসুন, আমরা অবহেলায় এই মাসটি পার না করে নফল রোজা, দান-সদকা এবং বেশি বেশি ইস্তিগফারের মাধ্যমে রমজানকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেই।

Post a Comment

Previous Post Next Post